ব্যালান্স অব পেমেন্ট

ট্রেড ও সার্ভিসে বড় ঘাটতি শক্তি কেবল রেমিট্যান্স

গত অর্থবছরে আমদানির তুলনায় বড় প্রবৃদ্ধি পেয়েছে রফতানি খাত। কিন্তু রফতানির এ উচ্চপ্রবৃদ্ধিও বাণিজ্য ঘাটতি তেমন কমাতে পারেনি।

গত অর্থবছরে আমদানির তুলনায় বড় প্রবৃদ্ধি পেয়েছে রফতানি খাত। কিন্তু রফতানির এ উচ্চপ্রবৃদ্ধিও বাণিজ্য ঘাটতি তেমন কমাতে পারেনি। অন্যদিকে আয়ের তুলনায় দেশের সার্ভিস বা সেবা খাতের ব্যয়ও ক্রমাগত বাড়ছে। এতে বাড়ছে সেবা খাতের ঘাটতির আকারও। বৈদেশিক লেনদেনের এ দুই ঘাটতির বিরূপ প্রভাব পড়ছে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে (ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা বিওপি)।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যালান্স অব পেমেন্টের পূর্ণাঙ্গ তথ্য গতকাল প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে দেখা যাচ্ছে, গত অর্থবছরে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৩৯ বা ২০ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে সার্ভিস বা সেবা খাতে ৫ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার ঘাটতিতে ছিল বাংলাদেশ। তবে বৈদেশিক বাণিজ্যের মৌলিক এ দুই আয়ের উৎসের ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে রেমিট্যান্স। গত অর্থবছরে প্রবাসীরা ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। রেকর্ড এ রেমিট্যান্সই দেশের বিওপিতে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। চার বছর পর অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ সূচকের ভারসাম্য উদ্বৃত্তের ধারায় ফিরেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছর শেষে দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ১৫ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। একই সময়ে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট বা রাষ্ট্রের আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ৩ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার। এ দুই হিসাব ইতিবাচক ধারায় ফেরার প্রভাবে ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা বিওপিতে ৩ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ। ২০২০-২১ অর্থবছরের পর টানা তিন বছর বিওপিতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিওপিতে ঘাটতি ছিল ৬ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছর ৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি হয়। সব মিলিয়ে এ তিন অর্থবছরে বিওপিতে ঘাটতি ছিল ১৯ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। বিওপির ঘাটতি হলে সেটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে পূরণ করতে হয়। এ ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া রিজার্ভ পরবর্তী তিন বছরে অর্ধেকে নেমে আসে।

বিওপি উদ্বৃত্তের ধারায় চলে আসায় বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তির জায়গায় ফিরেছে বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গত তিন বছর জুড়ে ডলারের যে সংকট ছিল, সেটি এ মুহূর্তে পুরোপুরি কেটে গেছে। ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী স্বাচ্ছন্দ্যে আমদানির এলসি খুলতে পারছেন। বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার পর ডলারের দর বাড়েনি। বরং এ মুহূর্তে বাজারে চাহিদার চেয়ে ডলারের জোগান বেশি। এ কারণে চলতি অর্থবছরের দেড় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বাজার থেকে ৬৪ কোটি ডলার কেনা হয়েছে।’

দেশের ডলার প্রবাহ ও বৈদেশিক বাণিজ্য পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় ‘ব্যালান্স অব পেমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে, যা বিওপি হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা বিওপির সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের আমদানি ব্যয় ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। গত অর্থবছরে ৬৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। বিপরীতে একই সময়ে ৪৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। এক্ষেত্রে রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। আমদানি থেকে রফতানি বাদ দেয়ার পর দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার।

তৈরি পোশাক খাতের ওপর ভর করে গত কয়েক দশকে দেশের রফতানি খাত সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে রফতানি পণ্যের সঙ্গে সংগতি রেখে সেবা রফতানি বাড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেবা রফতানি খাতে দেশের আয় ছিল ৬ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এর বিপরীতে সেবার জন্য বাংলাদেশকে ১২ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। অর্থাৎ গত অর্থবছরে সার্ভিস বা সেবা খাতে দেশের ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেবা খাতে ৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল। এ হিসাবে সেবা খাতে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ছিল গত অর্থবছরে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেবা খাতে বাংলাদেশের এ ঘাটতি আগামীতে আরো বাড়বে। কারণ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের তরুণরা অনেক পিছিয়ে রয়েছেন। প্রযুক্তি খাতের বেশির ভাগ সেবা আমাদের আমদানি করতে হয়। আমদানি-রফতানির জন্য সমুদ্রগামী জাহাজ কিংবা বিদেশ গমনের জন্য আমাদের যথেষ্ট সংখ্যক উড়োজাহাজও নেই। সেবা খাতের এ ঘাটতি আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরো ভোগাবে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সেবা খাতে বাংলাদেশের আয় বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ আছে। কিন্তু আমরা সে সুযোগ গ্রহণ করতে পারছি না। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বয়স এখন ২৬ বছরের নিচে। কিন্তু এ জনসংখ্যাকে আমরা সম্পদে রূপান্তর করতে পারিনি। আমাদের উচ্চ শিক্ষার মানও বেশ খারাপ। এ শিক্ষা ব্যবস্থা দেশের তরুণদের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মতো যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ কারণে সেবা খাতে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত করার সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।’

ড. জাহিদ আরো বলেন, ‘আমাদের তরুণদের একটি অংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আয় করছে। তবে এটি প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায় যৎসামান্য। ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির বাজারে ভারত এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে। সেবা খাতে আমরা যে অর্থ পাচ্ছি, তার বেশির ভাগ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে আয় করা। মিশনে পাঠানো সেনাদের বেতন-ভাতা ও সরঞ্জামের ভাড়া বাবদ আমরা এ অর্থ পাচ্ছি। দেশে এ মুহূর্তে নতুন কোনো বিদেশী বিনিয়োগ আসছে না। বিদেশী বিনিয়োগ হিসেবে যে অর্থ দেখা যাচ্ছে, সেটির বড় অংশই বিদ্যমান কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগ।’

আরও